সাজ্জাদুলের বদলি বাস্তবায়ন না হওয়া, জাফর আহমেদের বরখাস্ত ও পুনর্বহাল—নেপথ্যে কী?
চট্টবাণীর বিশেষ অনুসন্ধানঃ
চট্টগ্রাম বন্দরের এক কর্মচারীর বদলি ও পরবর্তী পোস্টিংকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। একই ঘটনায় সংস্থাপন শাখার এক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত এবং পরবর্তীতে পুনর্বহালের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাজ্জাদুল ইসলাম নামে এক কর্মচারীকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বদলির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই বদলি বাস্তবায়ন না করে তাকে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজারের দপ্তরের এপিএস এফসিএল শাখায় পোস্টিং দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চেয়ারম্যানের প্রশ্নের পরই বদলে যায় পরিস্থিতি?ঘটনাটি বন্দর চেয়ারম্যানের নজরে এলে তিনি বিষয়টি নিয়ে সরাসরি পরিচালক (ট্রাফিক) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলামকে জিজ্ঞাসা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চেয়ারম্যান জানতে চান, নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সাজ্জাদুল ইসলামকে ঢাকায় বদলি করা হয়নি কেন।এরপর অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টির দায় সংস্থাপন শাখার কর্মকর্তা জাফর আহমেদের ওপর বর্তানো হয় এবং পরবর্তীতে তাকে বরখাস্ত করা হয়।তবে এ ঘটনায় মূল প্রশ্ন হলো—জাফর আহমেদের কি কোনো কর্মচারীর বদলি বা পোস্টিংয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল?
সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, সাজ্জাদুল ইসলামের বদলি-সংক্রান্ত ফাইলে পরিচালক (ট্রাফিক) গোলাম সারওয়ারের অনুমোদন বা সম্পৃক্ততা ছিল। ফলে চেয়ারম্যানের জিজ্ঞাসাবাদের পর কেন সংস্থাপন শাখার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো, সেটি তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।ঘুষের অভিযোগও উঠেছেসাজ্জাদুল ইসলামের বদলি ও পরবর্তী পোস্টিংকে কেন্দ্র করে ঘুষ বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা চট্টবাণী স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট ফাইল, অফিস আদেশ, অনুমোদন, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ থাকলে তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বরখাস্তের পর পুনর্বহাল
জাফর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে পুনরায় চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বরখাস্ত ও পুনর্বহালের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দিতে পারবেন না।
অন্যদিকে পরিচালক (ট্রাফিক) গোলাম সারওয়ারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে জানতে বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া এ বিষয়ে অন্য কারও কথা বলার সুযোগ নেই।পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বন্দর শাখার কাছে জানতে চাইলে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।
গোলাম সারওয়ারের অতীত নিয়েও প্রশ্ন
পরিচালক (ট্রাফিক) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলামকে ঘিরে আরও কিছু অভিযোগ ও দাবি পাওয়া গেছে। তাঁর নিয়োগ, পূর্ববর্তী চাকরিচ্যুতি এবং পরবর্তীতে পুনর্বহাল নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে।
এছাড়া একজন সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রীর আত্মীয়তা এবং তাঁর সুপারিশে নিয়োগ পাওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, সেটিও সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
একইভাবে কোনো সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়া এবং পরে বিশেষ সম্পর্কের মাধ্যমে পুনর্বহালের যে দাবি রয়েছে, তারও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত চট্টবাণীর হাতে নেই।
তাই এসব বিষয়কে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে নয়, যাচাইযোগ্য অভিযোগ ও দাবির পর্যায়ে রাখা হচ্ছে।
যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
পুরো ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
১. সাজ্জাদুল ইসলামকে ঢাকায় বদলির নির্দেশনা কেন বাস্তবায়ন করা হয়নি?
২. তাকে চট্টগ্রামে পোস্টিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন?
৩. সংশ্লিষ্ট ফাইলে কার কার অনুমোদন ও স্বাক্ষর রয়েছে?
৪. জাফর আহমেদের কি ওই বদলি বা পোস্টিংয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল?
৫. তাকে বরখাস্ত করার সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল?
৬. বরখাস্তের আগে কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না?
৭. পরবর্তীতে কোন প্রক্রিয়ায় তাকে পুনর্বহাল করা হয়?
৮. ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা হয়েছিল কি না?
৯. গোলাম সারওয়ারের নিয়োগ, চাকরিচ্যুতি ও পুনর্বহালসংক্রান্ত সরকারি নথিতে কী তথ্য রয়েছে?
বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকবে সংশ্লিষ্টদের চট্টবাণী মনে করে, অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিচালক (ট্রাফিক) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলাম, জাফর আহমেদ, সাজ্জাদুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।কর্তৃপক্ষের লিখিত বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ, বদলি ও পোস্টিংয়ের ফাইল এবং তদন্তসংক্রান্ত নথি পাওয়া গেলে প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে সেগুলো প্রকাশ করা হবে।চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পোস্টিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টবাণীর অনুসন্ধান অব্যাহত।