১৫৬৩ নম্বর খতিয়ানে অন্যের নাম, সেই তথ্য গ্যাস সংযোগে কীভাবে? অংশীদারের অভিযোগ, ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বিল আদায়
নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের নিউমুরিং আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর রোডে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নির্মিত একটি ভবনকে ঘিরে জমির মালিকানা, খতিয়ান, ভবনের কাগজপত্র ও গ্যাস সংযোগের বৈধতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে অংশীদারদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন, গ্যাস মিটারের রিচার্জ কার্ড এবং ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে অতিরিক্ত গ্যাস বিল আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
ভবনটির এক অংশীদার জানে আলমের অভিযোগ, ভবনটিতে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার সময় মধ্যম হালিশহর এলাকার ১৫৬৩ নম্বর খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ভূমি অফিসে তল্লাশি এবং অনলাইন জরিপের তথ্য যাচাই করে ওই খতিয়ানে আহমদ শরীফ, পিতা—দরবেশ আলী-এর নাম পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—অন্য ব্যক্তির নামে থাকা এই খতিয়ানের তথ্য কীভাবে গ্যাস সংযোগের আবেদনে ব্যবহার করা হলো? খতিয়ানটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বৈধ দলিল, ক্রয়-বিক্রয় দলিল, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা মালিকানা-সংক্রান্ত অন্য কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল কি না, তা এখন যাচাইয়ের বিষয়।
১৫৬৩ নম্বর খতিয়ান ঘিরে বড় প্রশ্ন
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে ভূমি অফিসের তথ্য ও অনলাইন জরিপে ১৫৬৩ নম্বর খতিয়ানে আহমদ শরীফ, পিতা দরবেশ আলী-এর নাম পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।
অংশীদার জানে আলমের অভিযোগ, এই খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার করেই আরিফ নিউমুরিংয়ের ৬ নম্বর রোডের ভবনে গ্যাস সংযোগ নিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—১৫৬৩ নম্বর খতিয়ান যদি আহমদ শরীফের নামে হয়ে থাকে, তাহলে আরিফ কীভাবে ওই খতিয়ানের তথ্য গ্যাস সংযোগের কাগজপত্রে ব্যবহার করলেন?
খতিয়ানটির কপি কে সরবরাহ করেছেন, কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, গ্যাস সংযোগের আবেদনের সঙ্গে ঠিক কোন কোন নথি জমা দেওয়া হয়েছিল এবং আবেদনকারীর ওই খতিয়ান ব্যবহারের বৈধ অধিকার ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট ভূমি ও গ্যাস কর্তৃপক্ষের মূল নথি যাচাই করলেই স্পষ্ট হতে পারে।
তবে কোনো খতিয়ানে অন্য ব্যক্তির নাম থাকা এবং সেটি কোনো আবেদনে ব্যবহার করা হয়েছে—এ তথ্য থেকেই সরাসরি জালিয়াতি বা অপরাধ প্রমাণিত হয় না। সংশ্লিষ্ট দলিল ও নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।বিষয়টি নিয়ে ভবনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরিফের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়।ভবনটি নিউমুরিং আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর রোডে যথাযথভাবে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নিউমুরিং আবাসিক এলাকায় পাঁচশ বাড়ি যেরকম, আমারটাও সেরকম।”এরপর ১৫৬৩ নম্বর খতিয়ানে উল্লেখিত জমির অংশ তার নামে কি না জানতে চাইলে তিনি সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর না দিয়ে বিষয়টি “দেখতে হবে” বলে জানান।এ সময় খতিয়ানটি কীভাবে গ্যাস সংযোগের কাগজপত্রে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে তার কাছে কোনো বৈধ মালিকানা-সংক্রান্ত দলিল রয়েছে কি না—এসব বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়। তবে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়ার আগেই মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে তার কাছ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ওয়্যারিং থেকে বকেয়া বিল—খরচ জানে আলমের, দাবি ঠিকাদারেরভবনটির গ্যাসলাইনের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কন্ট্রাকটার হারুন জানান, গ্যাসলাইনের ওয়্যারিংয়ের প্রয়োজনীয় অর্থ জানে আলম পরিশোধ করেছেন।হারুনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু ওয়্যারিংয়ের খরচ নয়, ওয়্যারিংয়ের মালামাল, লাইনের ফিটিং চার্জসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খরচও জানে আলম বহন করেছেন।
এমনকি ডিজিটাল মিটার স্থাপনের আগে গ্যাসের যে বকেয়া বিল ছিল, সেসব বকেয়া বিলও জানে আলম পরিশোধ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
ঠিকাদারের এই বক্তব্য সত্য হলে গ্যাস সংযোগ ও মিটার স্থাপনের ক্ষেত্রে অংশীদারদের আর্থিক অবদান এবং পরবর্তীতে মিটারের রিচার্জ কার্ড কার কাছে রাখা হয়েছে—তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।
রিচার্জ কার্ড না দেওয়ার অভিযোগ জানে আলমের অভিযোগ, গ্যাসলাইনের ওয়্যারিং ও অন্যান্য খরচ তিনি বহন করলেও তার অংশের গ্যাস মিটারের রিচার্জ কার্ড তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
তার দাবি, কার্ডটি আরিফ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। ফলে নিজের অর্থে গ্যাস সংযোগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের খরচ বহন করার পরও মিটার ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনি সমস্যায় পড়ছেন।
তবে রিচার্জ কার্ড কার নামে ইস্যু হয়েছে এবং কার কাছে থাকার কথা—তা সংশ্লিষ্ট গ্যাস কর্তৃপক্ষের রেকর্ড যাচাই করলেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।ছয় চুলায় মাসে অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
জানে আলম আরও অভিযোগ করেন, ভবনের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে গ্যাস বিলের নামে প্রতি চুলায় মাসে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।ভবনে ছয়টি চুলা থাকায় তার হিসাবে প্রতি মাসে অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার টাকা।কয়েকজন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে কথা বলে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার বিষয়টি জানা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই অর্থ কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে, এর বিপরীতে কোনো রসিদ দেওয়া হচ্ছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট গ্যাস কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না—তা নথিপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
জানে আলম অভিযোগ করেন, তাকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি ও হুমকির মধ্যে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তার স্ত্রী এবং ছোট ভাই খোরশেদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
জানে আলমের ভাষ্য, তার স্ত্রী পাথরঘাটায় বসবাস করেন এবং গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিউমুরিং আবাসিক এলাকায় আসেননি। তার ছোট ভাই খোরশেদের বাসা সদরঘাট এলাকায় এবং তার দাবি অনুযায়ী গত প্রায় ১০ বছরেও খোরশেদ নিউমুরিং এলাকায় আসেননি।তাদের বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগের সঙ্গে নিউমুরিংয়ের ভবন ও অংশীদারত্বের বিরোধের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করলে পরিষ্কার হতে পারে।তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আরিফের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি
১৫৬৩ নম্বর খতিয়ানের প্রকৃত মালিকানা এবং ওই খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার করে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অংশীদার।বিশেষ করে ভূমি অফিসের রেকর্ডে যদি সত্যিই আহমদ শরীফ, পিতা দরবেশ আলী-এর নাম থাকে, তাহলে ওই খতিয়ানের তথ্য নিউমুরিংয়ের ভবনের গ্যাস সংযোগের কাজে কীভাবে এবং কোন নথির ভিত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছে—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল নথি পর্যালোচনা করে পরিষ্কার করা জরুরি।একই সঙ্গে ওয়্যারিং, ফিটিং, ডিজিটাল মিটার স্থাপনের আগের বকেয়া বিলসহ সব অর্থ কে পরিশোধ করেছেন, মিটারের রিচার্জ কার্ড কার নামে ইস্যু হয়েছে এবং ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বৈধ ভিত্তি কী—এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অংশীদার জানে আলম, সংশ্লিষ্ট ভাড়াটিয়া এবং গ্যাসলাইনের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কন্ট্রাকটার হারুনের বক্তব্য ও প্রাথমিক নথি অনুসন্ধানের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য ভূমি অফিসের মূল রেকর্ড, গ্যাস সংযোগের মূল কাগজপত্র, আর্থিক লেনদেনের রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। আরিফের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন; তবে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়ার আগেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।